❤ চিকনা বর ❤


আমার বর টা এত চিকনা যে আমার পাশে দাঁড়াইলে মনে হয় আমার ছোট ভাই।
বিয়ের দিন তো আত্মীয় স্বজনরা বরকে খুঁজেই পাচ্ছিলোনা।বর আমার পাশে থাকলেও সবাই যখন জিগ্গেস করছিলো,মাফি তোমার বর কই?আমি হেসে হেসে বলছিলাম এই যে আমার পাশেই আছে।পাশের বাড়ির আন্টি তখন আমতা আমতা করে বলছিলো,কিহ এইটা তোমার বর আমি তো ভাবছিলাম তোমার ছোট ভাই।আন্টির কথা শুনে বর লজ্জা পেয়ে ছুট,আমিও তার পিছনে পিছনে দৌঁড়।
দৌঁড়ে গিয়ে যখন জিগ্গেস করি,কি ব্যাপার এত ছুটছো কেন।বর চোখ বড় বড় করে আমাকে বলল,দ্যাখো মাফি আগে জানতাম আমাকে শুধু তোমারই ছোট ভাই মনে হয় কিন্তু এখন তো দেখছি তোমার গুষ্টিশুদ্ধ সবার আমাকে ছোট মনে হচ্ছে।এমন হলে আমাকে তো কেউ জামাই বলে ডাকবে না,কিনা মাফির ছোট ভাই বলেই ডেকে ফেলে।তুমি বিয়ার আগে দেখছিলানা আমি চিকনা,এত সমস্যা থাকলে বিয়া করলা ক্যান।এখন আমার মান সম্মান নিয়া টানাটানি করতেছো।
অনেকদিন আগের কথা, আমি চিকন ছেলে একটুও পছন্দ করতাম না।প্রেম হোক কিংবা বিয়ে দেখতে পারফেক্ট,এমন ছেলের সন্ধানেই ছিলাম আমি।ভাবতাম জিবনে বিয়া তো একবারই করবো,বরটা দেইখা যদি মানুষ না বলে দেখছো মাফির বরটা কি সুন্দর।তাইলে আর কি হইলো।সেইখানে কোনো চিকনি চামেলী কিংবা মটু সটু তো একদমই যাবেনা।পারফেক্ট একটা ছেলে চাই।
তো একদিন গেলাম শপিং করতে।ঘুরতে ঘুরতে দেখি আমার চিকনা একটার পর একটা জামা ট্রাই করতেছে।কিন্তু কিছুতেই একটাও তার হচ্ছে না।গোটা চারেক জামা প্যাকিং করে দোকানদার বলল,ভাই আপনি যে চিকনা, আপনার জামা তৈরি করতে বাংলাদেশের কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সেলাই মেশিন আছে কিনা সন্দেহ,তার থেকে বরং এইগুলা নিয়ে বাড়ি গিয়ে কেটে কুটে সাইজ করে নিবেন।তবে যদি আপনার বডিতে হয়।দোকানদারের কথা শুনে এত জোরে হেসে দিলাম যে,বর আমার সামনে এসে চোখ বড় বড় করে বলল,মজা নিচ্ছেন নাহ?আপনার কপালে যেন আমার থেকেও চিকনা বর জোটে।
আমিও মুখে ভেঙচি কেটে বললাম,,শুনেন আমার বর হবে রাজপুত্র বুঝছেন।আপনার মত চিকনা পোলাপান তো বাড়ির ভিতরেই ঢুকতে দেবো না।দেখলেই মনে হচ্ছে অপুষ্টিতে ভুগতেছেন।আমার বর কেমন হবে তা না ভেবে নিজের পুষ্টিগুণ বাড়ান।
বর আমার কথা শুনে তেঁতে গিয়ে ডান হাতের ইন্ডেক্স আঙুল আমার চোখের সামনে নিয়ে বলল,কেন রাজপুত্ররা বুঝি চিকনা হয়না?ন্যাকামি যত।বরের কথা শুনে এত পরিমান রাগ হচ্ছিলো যে মশলা দিয়ে কাঁচা আমের মত মাখিয়ে খেতে পারলে শান্তি পেতাম।কিন্তু সেই সুযোগ আর পেলাম না।চিকনা আমাকে কথাটা বলেই নিমিষেই ভ্যানিশ হয়ে গেলো।
তারপর একদিন গেলাম রেস্টুরেন্টে।গিয়ে বসে বসে টুক টুক করে খাচ্ছি।খেতে খেতে পাশ ফিরে দেখি আমার পাশের টেবিলে চিকনা বসা,টেবিলটা খাবারে এতটাই ভরা ছিল যে,মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সব খাবার ওনার টেবিলে জরো করা হইছে।আমি শুধু তাকিয়ে দেখলাম চিকনা একটার পর একটা খাচ্ছে।খাওয়ার পরে এমন জোরে এক ঢেকুর ছাড়লো যে,আমি সিউর এটা মুখ দিয়ে না ছেড়ে পিছন থেকে ছাড়লে চেয়ারটাই ফেটে যেত।আমি কোনো সংকোচ ছাড়াই ওনার সামনে গিয়ে বল্লাম,, আপনি কি রাক্ষস? এত খাবার খায় কেমনে মানুষ।আপনি যেমন চিকনা,পেট তো মনে হচ্ছে ছোটই হবে,তাইলে এত খাবার রাখলেন কই?চিকনা হাসতে হাসতে বলল,,আপনি বলছিলেন না আমি চিকনা,অপুষ্টিতে ভুগতেছি।দেখলেন তো কত খাই।তাও কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা এইটা কি আমার দোষ।শোনেন না জেনে কাউকে কখনও উল্টা পাল্টা বলবেন না,আপনার খাওয়াও তো দেখলাম। যেমন টুক টুক করে খান আপনি এখন আমার তো মনে হচ্ছে আমি একদিনে যা খাই আপনি তিন দিনেও তা খান না।অপুষ্টিতে আমি না আপনি ভুগছেন,তাইতো আপনার গলা দিয়ে খাবার নামেনা।গায়ে গোস্ত হইলেই সেইডারে পুষ্টি বলেনা,চিকনাদের পুষ্টির পরিমান একটু বেশিই থাকে বুঝেছেন।এখন আপনি বাড়ি গিয়ে পুষ্টি চর্চা করেন।
তারপর থেকে যেখানেই যাই সেইখানেই চিকনার সাথে আমার দেখা,ইনসল্ট,ঝগড়া,চিকনা বইলা টিটকারি মারতে মারতে একসময় এই চিকনার প্রেম আমার মনের ঘরে বসন্ত হয়ে আসলো।এই চিকনার প্রেমে আমি এতটাই ডুবে ছিলাম যে চিকনারে আর চিকনা নাহ,মনে হইতো বডিওয়ালা কোনো কুস্তিগির।
তো চুটিয়ে প্রেম করা অবস্থায় একদিন দুইজন রিকশায় ঘুরতেছিলাম।কথায় কথায় দুইজনার মধ্যে ঝামেলা লাগায় হুট করে রিকশাওয়ালা বলে উঠলো,,,
--আরে মিয়া বড় বোনের সাথে কেউ ঝগড়া করে।
রিকশাওয়ালার মুখে গার্লফ্রেন্ডরে বড় বোন শুইনা চিকু রেগে গিয়ে রিকশাওয়ালাকে ধমক দিয়ে বলল,দোহ মিয়া এইডা আমার বড় বোন হোক,বা ছোট বোন,কিংবা বউ হোক। আমার ইচ্ছা হইছে তাই ঝগড়া করতেছি।আপনার সমস্যা কি আপনি চালান তো।
তারপর থেকে চিকনা আমার সাথে ঘুরা তো দুরের কথা কোথাও যেতো না।কারন যেখানেই যাইতো লোকে ভাবতো অয় আমার ছোট ভাই।
তো একদিন বান্ধবিরা জেদ ধরলো আমার বফের সাথে দেখা করবে।কোনোমতে চিকনারে রাজি করাইয়া বান্ধবিদের সামনে গিয়া দাঁড়ালাম।বান্ধবিদের একজন যখন বলে উঠলো,,, কিরে তোর বফ কই?,,আমি উত্তর দেয়ার আগেই পাশ থেকে চিকনা বলল,,,জ্বি আমি মাফির ছোট ভাই,মাফির বফ পিছনে আসতেছে অপেক্ষা করুন।
চিকনার কথা শুইনা আমার প্রচন্ড রাগ হলো।মানুষ খেকোর মত রেগে বললাম,,তোমার সমস্যা কি?নিজেরে ছোট ভাই পরিচয় দিলা ক্যান।এইগুলার মানে কি।চিকনা তখন আমার হাত ধরে গম্ভীর স্বরে বলল,,,,দ্যাখো মাফি,তোমার ফ্রেন্ড এমনকি রিকশাওয়ালাও মানতে পারছেনা যে আমি তোমার বফ, সবাই ভাবে আমি তোমার ছোট ভাই।তাইলে তোমার পরিবার কি মানবে?তার থেকে বরং চলো আমরা ব্রেকাপ করে সত্যি সত্যিই ভাই বোন হয়ে যাই।আমিও বলে দিলাম,,,তোমার ভাই হওয়ার শখ জাগছে নাহ?আজকেই আব্বার সাথে গিয়া কথা বলে বর বানিয়ে নিবো।কি করে ভাই হইতে চাচ্ছো দেখে ছাড়বো।
কথা মতই কাজ করলাম।আব্বারে বললাম,,,আব্বা আমি এক ছেলেরে ভালবাসি তারে বিয়া করতে চাই।আব্বা বলল,,,নিয়া আসো দেখি কেমন ছেলে।
তো পরদিন বিকেলবেলা চিকনারে নিয়া আব্বার সামনে গিয়া বল্লাম,,আব্বা এইটা আপনার হবু জামাই।আব্বা চিকনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে হেসে হেসে বলল,,যাহ,মাফি তুমি তোমার বিয়ে নিয়েও আমার সাথে মজা করছো।নিশ্চয়ই এটা তোমার কলেজের ছোট ভাই হবে।আব্বার মুখেও ছোট ভাই শুনে চিকনা এবার বেঁহুশ।দুই ঘন্টা পর জ্ঞানন ফিরলে চিকনা ফুঁপিয়ে বলে উঠলো,,মাফি আমার মনে হয় জন্মই হইছে তোমার ছোট ভাই হওয়ার জন্য।এ জিবনে তোমার বর হইতে পারলাম না।আমি হেসে হেসে বললাম,,,ধুরর বোকা।আব্বা রাজি হইছে,সামনের মাসেই আমাদের বিয়া হবে।আর তুমি আমার ছোট ভাই না, বর-ই হবা।
চিকনা হেসে হেসে বলল,,সত্যিই বর হবো?আমিও বল্লাম,,হ্যাগো হ্যা,একদম চিকনা বর।এরপর চিকনার মুখে মাফি বলে এক চিৎকার শুনে ঘর থেকে পালালাম।
অবশেষে অনেক সাধনার পরে ছোট ভাইয়ের ফারা কাটিয়ে চিকনার সাথে আমার বিয়া হলো।কিন্তু তবুও সেই ছোট ভাই পিছু ছাড়লো না।বিয়ের দিনও কিনা আত্মীয়রা বলছে এইটা আমার ছোট ভাই।তাইলে আমার বরটা কষ্ট পাবেনা কেন।তাইতো আমাকে অতগুলা কথা শুনিয়ে মুখ ঘুরিয়ে আছে।
আমিও পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম,,ওরে আমার চিকনাটা,,আমি গর্বিত আমার বর চিকনা।আমার বান্ধবি,রিকশাওয়ালা কিংবা আত্মীয়রা কি তোমার সাথে সংসার করবে নাকি তোমার বউ করবে।তাইলে ওদের কথায় কান দিচ্ছো কেন।বউটা তো তোমায় বর-ই ভাবে তাই না,লোকে কি ভাবলো বা ভাবলো না তাতে কি আসে যায়।
বর আমার কথা শুনে পাশ ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,,কিন্তু মাফি তুমি তো বলো আমি অপুষ্টিতে ভুগছি,যদি আমাদের বাচ্চাও পুষ্টিহীনতায় ভোগে?
আমি হেসে বল্লাম,,,
--ব্যাপার না,বাচ্চাকেও বাবার মত এক টেবিল খাবার সাবাড় করা শিখিয়ে নেবো

Comments